Breaking

Thursday, April 26, 2012

পঞ্চম শ্রেণি - সমাজ - অধ্যায় ১৫ - আমাদের মুক্তিযুদ্ধের নয় মাস

 সংক্ষেপে উত্তর দাওঃ

প্রশ্নঃ (ক) পঁচিশে মার্চের কালরাতে হানাদার বাহিনীর নৃশংসতার বিবরণ দাও।
উত্তরঃ ১৯৭১ সালের সাতই মার্চ ঢাকার রেসকোর্স ময়দানে শেখ মুজিবুর রহমান অসহযোগ আন্দোলনের ডাক দেন। তাঁর নির্দেশে পূর্ব পাকিস্তানের সব প্রশাসনিক কর্মকাণ্ড চলতে থাকে। সমস্যা সমাধানের নামে আলোচনা করতে ঢাকায় আসেন পাকিস্তানের প্রেসিডেন্ট জেনারেল ইয়াহিয়া খান। পরে এসে যোগ দেন পশ্চিম পাকিস্তানি পিপলস পার্টির নেতা জুলফিকার আলী ভুট্টো। ১০ দিন ধরে আলোচনার নামে চলে প্রহসন। এ সময় পশ্চিম পাকিস্তান থেকে সুকৌশলে সেনাবাহিনী ও অস্ত্রশস্ত্র এনে বাঙালিদের দমন করার সব প্রস্তুতি সম্পন্ন করা হয়। এরপর পঁচিশে মার্চ সন্ধ্যায় কোনোরূপ ঘোষণা ছাড়াই ইয়াহিয়া খান ও ভুট্টো ঢাকা ত্যাগ করেন। যাওয়ার আগে ইয়াহিয়া খান গণহত্যার নির্দেশ দেন। পূর্ব পাকিস্তানের মানুষের স্বাধীনতার স্বপ্নকে চিরদিনের জন্য থামিয়ে দিতে এই গণহত্যার পরিকল্পনা করা হয়। পাকিস্তানি কর্তৃপক্ষ এই পরিকল্পনার নাম দেয় অপারেশন সার্চলাইট। এই অপারেশনের সার্বিক দায়িত্বে থাকেন লেফটেন্যান্ট জেনারেল টিক্কা খান। 

কালরাত বলার কারণঃ পাকিস্তানি সেনারা পঁচিশে মার্চের মধ্যরাতে নিরীহ ও নিরস্ত্র ঘুমন্ত বাঙালিদের ওপর ঝাঁপিয়ে পড়ে। তারা ট্যাংক, ভারী কামান ও নানা আধুনিক অস্ত্রশস্ত্র নিয়ে নিষ্ঠুর হত্যাযজ্ঞে মেতে ওঠে। তারা রাজারবাগ পুলিশ লাইন, পিলখানা ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বিভিন্ন আবাসিক হল আক্রমণ করে। এ ছাড়া হলসংলগ্ন শিক্ষকদের বাসগৃহে, কর্মকর্তা-কর্মচারীদের বাসস্থানে, বিভিন্ন দলীয় কার্যালয়ে তারা এই বর্বরোচিত হামলা চালায়। এসব স্থানে বাঙালি পুলিশ, ইপিআর বাহিনীর বাঙালি সদস্য, ছাত্রছাত্রী, শিক্ষক, কর্মকর্তা-কর্মচারীদের নির্বিচারে হত্যা করা হয়। অন্যান্য স্থানেও তারা নির্মম হত্যাকাণ্ড শুরু করে। বাড়িঘর, দোকানপাট ও ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান পুড়িয়ে দেয় এবং লুটপাট করে। বিদেশে সংবাদ প্রেরণের ওপর কড়াকড়ি আরোপ করে। ঢাকা শহর বধ্যভূমি ও ধ্বংসস্তূপে পরিণত হয়। এ জন্য ১৯৭১ সালের পঁচিশে মার্চ রাতকে কালরাত বলা হয়।

প্রশ্নঃ (খ) মুক্তিযুদ্ধে প্রবাসী বাংলাদেশ সরকারের ভূমিকা কী ছিল?
উত্তরঃ মুক্তিযুদ্ধে প্রবাসী বাংলাদেশ সরকারের ভূমিকা ছিল অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ। ১৯৭০ সালের নির্বাচিত গণপ্রতিনিধিদের সমন্বয়ে ১৯৭১ সালের ১০ এপ্রিল আগরতলায় গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকার গঠিত হয়। এ সরকার ছিল অস্থায়ী প্রবাসী সরকার। তাজউদ্দীন আহমদ এ সরকারের প্রধানমন্ত্রীর দায়িত্ব পান। ১৭ এপ্রিল এই সরকার মেহেরপুর জেলার বৈদ্যনাথতলা (মুজিব নগর) গ্রামের আমবাগানে শপথ নেন। ইস্ট বেঙ্গল রেজিমেন্ট, ইপিআরের বাঙালি সদস্য, পুলিশ, আনসার, ছাত্র, যুবক, নারী, কৃষক, শ্রমিক, বুদ্ধিজীবী নিয়ে গড়ে ওঠে মুক্তিবাহিনী। জেনারেল মুহম্মদ আতাউল গণি ওসমানীকে মুক্তিযুদ্ধের সর্বাধিনায়ক হিসেবে নিযুক্ত করা হয়। 

মুক্তিযুদ্ধ সঠিকভাবে পরিচালনা করা, দেশের জনগণের সমর্থন আদায় করা এবং বিদেশে বাংলাদেশের স্বাধীনতার পক্ষে সরকার ও জনগণের সমর্থন পাওয়ার জন্য এই সরকার গঠন ছিল অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। এক কথায় বলতে গেলে মুক্তিযুদ্ধ পরিচালনা, অস্ত্র সংগ্রহ, অর্থ সংগ্রহ, বিদেশের সমর্থন আদায় ইত্যাদি ক্ষেত্রে প্রবাসী বাংলাদেশ সরকার গুরুত্বপূর্ণ ও প্রশংসনীয় ভূমিকা পালন করেছে।

প্রশ্নঃ (গ) কাদের নিয়ে মুক্তিবাহিনী গঠিত হয়?
উত্তরঃ ১৯৭০ সালের নির্বাচিত গণপ্রতিনিধিদের সমন্বয়ে ১৯৭১ সালের ১০ এপ্রিল ভারতের আগরতলায় গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকার গঠিত হয়। সরকার মুক্তিবাহিনী গঠনের উদ্যোগ নেয়। ইস্ট বেঙ্গল রেজিমেন্ট, ইপিআরের বাঙালি সদস্য, পুলিশ, আনসার, ছাত্র, যুবক, নারী, কৃষক, শ্রমিক, বুদ্ধিজীবী নিয়ে গড়ে ওঠে মুক্তিবাহিনী। জেনারেল মুহাম্মদ আতাউল গণি ওসমানীকে মুক্তিবাহিনীর প্রধান নিযুক্ত করা হয়।

প্রশ্নঃ (ঘ) মুত্তিযুদ্ধে সামরিক-বেসামরিক বাহিনীর ভূমিকা লেখো।
উত্তরঃ মুক্তিযুদ্ধে সামরিক ও বেসামরিক জনগণের প্রত্যক্ষ অংশগ্রহণে বেশকিছু বাহিনী গড়ে উঠেছিল। তারা বিভিন্নভাবে পাকিস্তানি বাহিনীর বিরুদ্ধে আক্রমণ পরিচালনা করে। মুক্তিযুদ্ধ কার্যকরভাবে পরিচালনার জন্য সারা বাংলাদেশকে ১১টি সেক্টরে ভাগ করা হয়। পাকিস্তান সেনাবাহিনীতে কর্মরত পূর্ব বাংলার অফিসার, সৈনিক, পুলিশ, ইপিআর, নৌ-বিমান বাহিনীর সদস্যরা এসব বাহিনীর গঠন ও পরিচালনায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন। নিয়মিত সেনা, গেরিলা ও সাধারণ যোদ্ধারা এতে যোগদান করেন। তাঁদের মুক্তিবাহিনী বা মুক্তিফৌজ বলা হতো। দেশের কৃষক, শ্রমিক, ছাত্র-জনতা বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের উদ্যোগে বেশকিছু বাহিনী গড়ে তোলা হয়। ভারতে প্রশিক্ষণ শেষে তারাও দেশের ভেতরে ব্যাপকভাবে ছড়িয়ে পড়ে। দেশের অভ্যন্তরেও অনেক ছোট ছোট বাহিনী গড়ে তুলে পাকিস্তানি বাহিনী ও রাজাকার বাহিনীকে আক্রমণ করে। যুদ্ধের নয় মাস বাংলাদেশের এসব মুক্তিবাহিনী স্থল, জল ও আকাশপথে আক্রমণ করে পাকিস্তান বাহিনীকে কাবু করে। এ ছাড়া গ্রামাঞ্চলে সংগ্রাম কমিটি গঠন করে মানুষ মুক্তিবাহিনীকে থাকা, খাওয়া ও যুদ্ধে সাহায্য করে।

প্রশ্নঃ (ঙ) মুক্তিযুদ্ধে প্রতিবেশী ও বর্হিবিশ্বে মিত্র দেশের ভূমিকা ব্যাখ্যা করো।
উত্তরঃ বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধে প্রতিবেশী রাষ্ট্র ভারতের ভূমিকা ছিল অত্যন্ত সহযোগিতাপূর্ণ। ২৫শে মার্চ রাতে হানাদার বাহিনীর নির্বিচারে গণহত্যা ও ধ্বংসযজ্ঞের পর থেকেই এ দেশের সকল স্তরের প্রায় এক কোটি শরণার্থীর থাকার ব্যবস্থা করে ভারত সরকার। তারা ভরণ-পোষণসহ নানা রকম সাহায্য-সহযোগিতা প্রদানে এগিয়ে আসে, মুক্তিযোদ্ধাদের প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করে। একপর্যায়ে সামরিক শক্তি দিয়েও তারা বাংলাদেশকে সহায়তা করে। মুক্তিযুদ্ধ চলাকালে ভারত সরকার ১৯৭১ সালের ৬ ডিসেম্বর বাংলাদেশকে প্রথম স্বীকৃতি দেয়। ৭ ডিসেম্বর স্বীকৃতি দেয় প্রতিবেশী রাষ্ট্র ভুটান। বহির্বিশ্বে সাবেক সোভিয়েত ইউনিয়ন ও তার মিত্র দেশগুলো যুক্তরাজ্য, জাপান এবং পশ্চিমের অনেক দেশের সাধারণ জনগণ বাংলাদেশের পক্ষে অবস্থান নেয়। কারণ সবাই বুঝেছিল যে বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধ একটি ন্যায়সংগত যুদ্ধ। বাঙালির ওপর পাকিস্তানি বাহিনীর নৃশংসতা ও গণহত্যা তাদের কাছে সমর্থনযোগ্য ছিল না। বিভিন্ন দেশের বহু বিশিষ্ট নাগরিকও আমাদের মুক্তিযুদ্ধে নানাভাবে অবদান রাখেন। তবে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র, চীন, সৌদি আরবসহ কয়েকটি দেশের সরকার বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধে বিরোধিতা করে।

প্রশ্নঃ (চ) মুক্তিযুদ্ধে প্রবাসী বাঙালিদের ভূমিকা সম্পর্কে লেখো।
উত্তরঃ বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধে প্রবাসী বাঙালিরা উল্লেখযোগ্য ভূমিকা পালন করেন। তাঁরা নগদ অর্থ, খাদ্য, ওষুধ প্রভৃতি সংগ্রহ করে যুদ্ধ পরিচালনায় ও বিপন্ন শরণার্থীদের সাহায্যার্থে এগিয়ে আসেন। তা ছাড়া মুক্তিযুদ্ধের পক্ষে বিশ্ব জনমত গড়ে তুলতেও তাঁরা অবদান রাখেন। পাকিস্তানি কূটনৈতিক মিশনের অনেক বাঙালি কূটনীতিক পাকিস্তান সরকারের চাকরি ছেড়ে বাংলাদেশের প্রতি আনুগত্য প্রকাশ করেন।

প্রশ্নঃ (ছ) হানাদার বাহিনী কর্তৃক বুদ্ধিজীবী হত্যার কারণ উল্লেখ করো।
উত্তরঃ পরাজয় নিশ্চিত বুঝতে পেরে পাকিস্তান শাসকচক্র বাংলাদেশকে চিরতরে মেধাশূন্য করার এক ঘৃণ্য পরিকল্পনা বাস্তবায়নে অগ্রসর হয়। তারা ভেবেছিল, এ দেশকে মেধাশূন্য করা গেলে বাঙালি জাতির মেরুদণ্ড ভেঙে যাবে। আমরা কোনো দিন বিশ্বের বুকে মাথা উঁচু করে দাঁড়াতে পারব না। তাই তারা বুদ্ধিজীবী নিধনের ষড়যন্ত্র করে। মুক্তিযুদ্ধের শুরু থেকেই নানাভাবে বুদ্ধিজীবী হত্যায় লিপ্ত হয় তারা। তবে ১০ থেকে ১৪ ডিসেম্বরের মধ্যে এই বর্বরতা ও হত্যাযজ্ঞ ভয়াবহ রূপ ধারণ করে। পাকিস্তানি শাসকগোষ্ঠীর নির্দেশনা ও মদদে রাজাকার, আলবদর, আল-শামসসহ এ দেশীয় একশ্রেণীর দালালরা এই হত্যাযজ্ঞ ঘটায়। তারা সন্তোষচন্দ্র ভট্টাচার্য, মুনীর চৌধুরী, মোফাজ্জল হায়দার চৌধুরী, শহীদুল্লা কায়সার, ডা. ফজলে রাব্বিসহ এ দেশের প্রথম সারির অনেক বুদ্ধিজীবীকে নির্মমভাবে হত্যা করে। পরে ঢাকার মিরপুর ও রায়ের বাজারের বধ্যভূমিতে তাঁদের অনেকের বিকৃত লাশ পাওয়া যায়। শহীদ বুদ্ধিজীবীদের স্মরণে প্রতিবছর ১৪ ডিসেম্বর আমরা ‘শহীদ বুদ্ধিজীবী দিবস’ পালন করি।

প্রশ্নঃ (জ) মুক্তিযুদ্ধের তাৎপর্য ব্যাখ্যা করো।
উত্তরঃ মুক্তিযুদ্ধের শেষের দিকে আমাদের মুক্তিবাহিনী ও ভারতীয় মিত্র বাহিনী নিয়ে একটি যৌথ কমান্ড গঠিত হয়। পাকিস্তান একপর্যায়ে ভারত আক্রমণ করলে এই যৌথ কমান্ড একযোগে স্থল, নৌ ও আকাশপথে আক্রমণ চালিয়ে দ্রুত পাকিস্তানি বাহিনীকে দুর্বল করে ফেলে। ৯ থেকে ১৩ ডিসেম্বরের মধ্যে বাংলাদেশের অধিকাংশ অঞ্চল শত্রুমুক্ত হয়। ২৫ মার্চ রাতে হানাদার বাহিনীর নির্বিচারে গণহত্যা ও ধ্বংসযজ্ঞের পর থেকেই এ দেশের সব স্তরের প্রায় এক কোটি মানুষ শরণার্থীদের থাকার ব্যবস্থা করে। তারা ভরণ-পোষণ সহ নানা রকম সাহায্য-সহযোগিতা প্রদানে এগিয়ে আসে। ভারত সরকার মুক্তিযোদ্ধাদের প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করে। একপর্যায়ে সামরিক শক্তি দিয়েও তারা বাংলাদেশকে সহায়তা করে। মুক্তিযুদ্ধ চলাকালে ভারত ১৯৭১ সালের ৬ ডিসেম্বর বাংলাদেশকে প্রথম স্বীকৃতি দেয়। ৭ ডিসেম্বর স্বীকৃতি দেয় প্রতিবেশী রাষ্ট্র ভুটান। বহির্বিশ্বে সাবেক সোভিয়েত ইউনিয়ন ও তার মিত্র দেশগলো যুক্তরাজ্য, জাপান ও পশ্চিমের অনেক দেশের সাধারণ জনগণ বাংলাদেশের পক্ষে অবস্থান নেয়। কারণ, সবাই বুঝেছিল যে বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধ একটি ন্যায়সংগত যুদ্ধ। বাঙালির ওপর পাকিস্তানি বাহিনীর নৃশংসতা ও গণহত্যা তাদের কাছে সমর্থনযোগ্য ছিল না। বিভিন্ন দেশের বহু বিশিষ্ট নাগরিকও আমাদের মুক্তিযুদ্ধে নানাভাবে অবদান রাখেন। তবে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র, চীন ও সৌদি আরবসহ কয়েকটি দেশের সরকার বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধে বিরোধিতা করে।

No comments:

Post a Comment

Clicky